Image description

গ্রামে সেটেল্ড হবার কথা

সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য গ্রামকে কেন বেছে নিয়েছি

গ্রামে সেটেল্ড হওয়ার কথা ভাবলেই সবার প্রথম যে দুশ্চিন্তাটা আসে, তা হলো— “বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?”

গ্রামে তো ভালো স্কুল নেই, সুযোগ-সুবিধা কম, শহরের মতো আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নেই— শহরের পড়াশোনা ছাড়া বাচ্চারা কি সত্যিই ভালোভাবে বড় হতে পারবে?

আমার কাছে উত্তরটা হলো—অবশ্যই পারবে। কারণ আজকের দিনে “সুশিক্ষা” আর শুধু শহরের চার দেয়ালের নামী-দামি স্কুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের সেরা শিক্ষক, শিক্ষামূলক কোর্স এবং অসংখ্য শেখার সুযোগ এখন ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব।

শিক্ষার জন্য কি প্রতিদিন স্কুলে যেতেই হবে?

আমি আমার সন্তানদের হোমস্কুলিং বা ঘরে থেকে শেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বোর্ডের বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষামূলক কোর্স, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি, সৃজনশীল কাজ এবং বাস্তব জীবনের নানা দক্ষতা তারা ঘরে বসেই শিখতে পারবে।

ভবিষ্যতে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেটের বিষয়টিও পরীক্ষার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সার্টিফিকেটের জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট স্কুলে গিয়ে বসে থাকাই শিক্ষার একমাত্র পথ—আমি অন্তত সেটা মনে করি না।

বরং শহরের স্কুলের গণ্ডিবদ্ধ সিলেবাসের পাশাপাশি যদি সন্তানকে নিজের আগ্রহ অনুযায়ী শেখার সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে তার মেধার বিকাশ আরও স্বাধীনভাবে হতে পারে।

শহরের জীবনই কি উন্নত জীবনের একমাত্র সংজ্ঞা?

শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দি জীবন, সারাক্ষণ এসি রুমে থাকা, যানজটের ক্লান্তি আর দিনের বড় একটা সময় মোবাইল-ট্যাবের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা— এই জীবনকে কি সত্যিই সবসময় “উন্নত জীবন” বলা যায়?

শহরের সুযোগ-সুবিধার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খোলা জায়গা, প্রকৃতি, খেলাধুলা এবং স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামের প্রকৃতিতে শিশুর বেড়ে ওঠা গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ

চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ভয় কি অমূলক?

বাকি থাকল চিকিৎসা ব্যবস্থা। শহরের হাসপাতালগুলোতেও তো মানুষের হাহাকার দেখেছি। তাই শুধু হাসপাতাল কাছে থাকলেই যে একটি শিশু বেশি সুস্থ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

গ্রামের জীবনেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সঠিক পরিকল্পনা করে থাকলে সন্তানকে তুলনামূলকভাবে খোলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় করার সুযোগ পাওয়া যায়।

নির্মল বাতাস, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, তাজা খাবার এবং মাঠে দৌড়ঝাঁপ— শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এগুলোর গুরুত্ব অনেক।

প্রকৃতিই যখন সবচেয়ে বড় শ্রেণিকক্ষ

বইয়ের পাতায় “সবুজ প্রকৃতি” বা “নদী” চেনার চেয়ে নিজের চোখে ব্যাঙের রূপান্তর দেখা, পাখির ডাক চিনতে শেখা, গাছের পরিচর্যা করা কিংবা মাটির গন্ধ অনুভব করা অনেক বড় শিক্ষা।

একটি শিশু যখন নিজের হাতে একটি গাছ লাগায়, প্রতিদিন সেটার যত্ন নেয় এবং ধীরে ধীরে গাছটিকে বড় হতে দেখে—তখন সে শুধু একটি গাছ সম্পর্কে জানে না; সে ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং জীবনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কেও শেখে।

নিজের চোখে প্রকৃতিকে দেখা এবং নিজের হাতে কিছু করার এই বাস্তব অভিজ্ঞতা কোনো শহরের এসি ক্লাসরুমে বসে পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব বলে আপনার মনে হয়?

হ্যাঁ, আমাদের একটু বেশি দায়িত্ব নিতে হবে

অবশ্যই এই পথটা সহজ নয়। আমাদের হয়তো একটু বাড়তি কষ্ট করতে হবে। সন্তানের পড়াশোনার পেছনে নিজেদের সময় দিতে হবে, শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং তার আগ্রহ ও মেধা অনুযায়ী তাকে গাইড করতে হবে।

কিন্তু একটি শিশুর সুস্থ শৈশব, রোগমুক্ত শরীর, সুন্দর মানসিকতা, আত্মনির্ভরতা এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতার চেয়ে দামি আর কী হতে পারে?

“জিপিএ-৫ পাওয়ার চেয়ে আমার সন্তান একজন সুস্থ, সৎ, দক্ষ ও ভালো মানুষ হয়ে উঠুক— এটাই আমাদের চাওয়া।”

আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের জীবন

আসলে যার যার সিদ্ধান্ত তার নিজের চাওয়া-পাওয়ার ওপর নির্ভর করে। আপনার চাওয়া যদি হয় শহরের ঝলমলে, ব্যস্ত এবং সুযোগ-সুবিধায় ভরা জীবন, তাহলে আপনার সিদ্ধান্তও সেভাবেই হবে।

আর আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য গ্রামকে বেছে নিয়েছি।

এর মানে এই নয় যে আমরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরে থাকতে চাই। বরং গ্রামের প্রকৃতি ও শান্ত পরিবেশের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় করেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

এখানে কীভাবে আরও উন্নতভাবে থাকা যায়, কীভাবে সন্তানদের জন্য ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা যায় এবং কীভাবে একটি নিরাপদ, সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর জীবন গড়ে তোলা যায়—আমরা এখন সেই চেষ্টাই করছি।

শহর না গ্রাম—সিদ্ধান্তটা আসলে জায়গার নয়, জীবনদর্শনের।
আমাদের কাছে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ মানে শুধু ভালো ক্যারিয়ার নয়; তার সঙ্গে একটি সুস্থ শরীর, সুন্দর মন, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।